Main Menu

আজ ২৬ নভেম্বর, মুক্তিযুদ্ধে কামান্না শহীদ দিবস- পরেশ কান্তি সাহা

DSC_4152

বিশেষ নিবন্ধ, মাগুরাবার্তা
জানিনা সেদিন আকাশে লক্ষ কোটি নক্ষত্ররা জ্বলেছিল কিনা, বাতাস স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কিনা, ভোরের পাখিরা কলরব করেছিল কিনা, তবে স্মরণকালের কুয়াশারা যে অঝোরে কেঁদেছিল, সেটা ছিল চাক্ষুস প্রমাণ। তা না হলে কেন ঝরে যাবে এক ঝাঁক তরুণ তরতাজা জীবন প্রদীপ? এমনটা তো হবার কথা নয়। তারপরও কেন হলো? আরতো মাত্র বাকি ছিল বিশটা দিন। তারপরইনা আকাশে উদীয়মান হলো স্বাধীনতা নামক সূর্য।
কামান্না নিভৃতপল্লী শৈলকুপা থানায় অবস্থিত। ঝিনেদা, মাগুরা এবং কুষ্টিয়া জেলার প্রায় মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত হয়েও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামান্নায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ করলো। তারা কি জানতোনা পাশেই রয়েছে দুর্ধর্ষ শ্রীপুর বাহিনী এবং মুজিব বাহিনী? তারপরও কেন ঘটলো এমন ঘটনা!
শুধুমাত্র পলাশী প্রান্তরেই মীরজাফরের আবির্ভাব ঘটেনি। পৃথিবীর আদি থেকেই মীরজাফর ছিল, আছে এবং থাকবে। এই মীরজাফরের দল যদি না থাকতো, তাহলে ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দু’লক্ষ মা বোনের ইজ্জত, এক কোটি স্মরণার্থীদের অবর্ননীয় কষ্ট, ঘর-বাড়ি অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট কোনটাই এতো হতো না। তেমনই মীরজাফরের আত্মারা ছিল কোদালিয়ার রাজাকার বাহিনী। তাদের দেয়া সংবাদের ভিত্তিতেই ঝিনেদা থেকে পাকিস্তানি সেনারা আসে কামান্নায়। আজকের দিনে ভোরে তিনদিক থেকে আক্রমণ করে কামান্না মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। ওখানে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭৫ জন থাকলেও মাধব চন্দ্র ভৌমিকের দোতলা টিনের ঘরে ছিলেন ৪৫ জন। অন্যরা ছিলেন গ্রামের অন্যান্য বাড়িতে। কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার মেজর শমশের আলী। তিনিও ছিলেন বাইরে। ডিউটি কমান্ডার ছিলেন এস এম আব্দুর রহমান এবং আব্দুর রশিদ মোল্যা। ভোর হয়ে যাওয়ায় সেন্ট্রি ডিউটি ছেড়ে ঘরে চলে আসেন। আবুল বাসার আলী বাইরে পায়খানা সেরে ঘরে ঢোকার সময় টের পান পাকিস্তানি সেনারা আসছে। খবরটা আলী হোসেনকে দেন। আলী হোসেন বিশ্বাস না করে যেই দরজা খোলেন, আর তখনই পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছোড়ে। তিনি শহীদ হন। মূহূর্তেই পাকিস্তানি সেনারা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও জেগে ওঠে এবং পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকেন। পাকিস্তানি সেনাদের প্রচন্ড আক্রমণে মুক্তিবাহিনী টিকে থাকতে পারেননা। পরে কেউ কেউ এদিকে-সেদিকে পালিয়ে যান। এস এম আব্দুর রহমান ছিলেন নিরস্ত্র। তার এসএমজি-টি লিয়াকত আলী নিয়ে গিয়েছিলেন তার গ্রামের বাড়ি গৌরীচরণপুরে। নিরস্ত্র থাকায় কোন প্রতিরোধ করতে পারেননি। উপরোন্ত পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। একটুর জন্য জীবন বাঁচে। রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণায় ছটপট করতে থাকেন। পাশে ছিল লুলু। গামছা দিয়ে পা বেঁধে অতিকষ্টে সিঁড়ি বেয়ে দোতলা টিনের ঘরে ওঠেন। একটি বড় ক্যাশ বাক্সের খোলা ডালার নিচে কোন ভাবে লুকিয়ে থাকেন। পাকিস্তানি সেনারা তন্ন তন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে থাকে। কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা না গেলে বেয়োনেট চার্জ করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা সারেন্ডার করলেও ১ জনকে ছেড়ে দেয়Ñ বাকি ৫ জনকে হাত বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। এসময় পূর্ব দিক বগুড়া থেকে মুজিববাহিনীর কমান্ডার লুৎফর রহমান ৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গুলি ছুড়তে থাকলে পাকিস্তানি সেনারা কামান্না ত্যাগ করে। পরে গ্রামবাসীরা এসে আব্দুর রহমানকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হন। এই যুদ্ধে শহীদ হন ২৭ জন। এতদাঞ্চলে একদিনে এতো মুক্তিযোদ্ধার প্রাণহানী আর কোথাও ঘটেনি। এ এক বিভৎস দৃশ্য। পরে গ্রামবাসীদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা ২৭ জন শহিদকে গণকবর দেন। আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সঙ্গী এবং স্বজন হারাদের আর্তচিৎকার।
এ প্রসঙ্গে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এস এম আব্দুর রহমান বলেনÑ২৭ জন শহীদদের মধ্যে শহিদ গোলজার খাঁ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা। তিনি ছিলেন মুজাহিদ। একদিন কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন Ñ বিষয়খালীর যুদ্ধে তার একজন সহযোদ্ধা এবং হাজিপুরের যুদ্ধে অব্দুল আজিজ পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহিদ হন। আমি আর পাকিস্তানি যোদ্ধাদের গুলিতে মরবো না। একটা গুলি দেখিয়ে বলেছিলেনÑএটি দিয়ে প্রয়োজনে পা দিয়ে ট্রিগার চেপে আত্মহত্যা করবো। কামান্না যুদ্ধে ঐ গুলিটা দিয়েই গোলজার আত্মহত্যা করেন। একই কথা বলেন কামান্না যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া অক্ষত মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রসুল মিয়া। তিনি বলেনÑ ট্রিগার চেপে গোলজার আত্মহত্যা করলে তার মাথার ঘিলু গোলাম রসুলের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটাও ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলজারের দেশাত্মবোধের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন, দিয়ে গেলেন লাল সবুজের পতাকা। যে পতাকা সারা বিশ্বে পতপত করে উড়ছে। তার এই আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের স্মৃতি চিরস্মরণীয় করার জন্য তাদের নিজ বাড়িতে অথবা গ্রামের সুবিধাজনক স্থানে স্মৃতিফলক উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবী। এটা হলে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানবেÑঝরে যাওয়া রক্ত গোলাপদের আত্মত্যাগ। শেষ করতে চাই রবীন্দ্রনাথকে দিয়েইÑ
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

11272_111343562387372_889221266_n
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও গবেষক
ই-মেইল : pareshsaha49@gmail.com






Comments are Closed