Main Menu

মাগুরা পৌর কাউন্সিলর আশুতোষের অবৈধ যোগসাযোশে

সরকারি খাল দখল করে প্লট বাণিজ্য ! হাজার পরিবারে জলাবদ্ধতার আশংকা

Magura Khal Dokhol Pic 1

রূপক আইচ, মাগুরা
মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় এলাকা দিয়ে শহরের ২টি ওয়ার্ডের পানি নিস্কাষনের একমাত্র পৌর খালটির বড় একটি অংশ স্থানীয় এক ভূমি দস্যুকে স্থানীয় কাউন্সিলর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে প্লট আকারে বেঁচে দিতে সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই এলাকার জমি প্লট আকারে বিক্রি করতে গিয়ে পাশের সরকারি খালটির প্রায় অর্ধেক অধৈক দখল করে নেয়ায় সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে মাগুরা পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আশুতোষ সাহার বিরুদ্ধে। এ সময় কাউন্সিলর ও পৌর নায়েবের উপস্থিতিতে খালের অর্ধেক ভেতরে সিমানা চিহ্নিত করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন জমির ক্রেতারা। অন্যদিকে খালটি দখল হয়ে গেলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের বিপাকে পড়বে বলে আশংকা করছেন এলাকার সচেতন জনগণ।
মাগুরার জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়রের কাছে এক লিখিত অভিযোগে এলাকাবাসি জানান, শহরের ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডে কলেজপাড়া, দরি মাগুরা, সাহা পাড়া, নতুন বাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাষনের একমাত্র ব্যবস্থা বড়দোয়া (বড় জলাশয়) থেকে বের হওয়া দাসের ঘাট এর পাশে একটি পৌর কালভার্ট আছে। স্থানীয়দের মতে প্রবহমান খালটি শত বছর ধরে অন্তত ২০ ফুট চওড়া। তার পাশে একটি হালট রাস্তাও রয়েছে। সরকারি ম্যাপেও খালটির অবস্থান দৃশ্যমান। এ খালটি দিয়ে শহরের একটি বড় অংশের পানি নিষ্কাসন হয়ে নবগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ে। খালটি বন্ধ হয়ে গেলে বা সংকুচিত হয়ে গেলে শহরের পানি ব্যবস্থাপনা মারাত্মক হুমিকির মুখে পড়বে। এতে ব্যাপক জলাবদ্ধতায় এ অঞ্চলের পৌরবাসির ভোগান্তি চরমে পৌঁছবে। ইতিপূর্বে খালের পাড় থেকে অন্তত ৩ হাত উপরে কচা গাছের বেড়া দেয়া ছিল। সম্প্রতি ওই এলাকার দাসেদের ভিটা খ্যাত ৩ একর ৮৬ শতকের একটি জমি প্লট আকারে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় অমূল্য সাহার বড় ছেলে প্রশাস্ত কুমার সাহা। ওই জমি বিক্রির জন্য প্রশান্ত সাহা ঘোষণা দেয়ার পরপর খালের পাড়ের কচার বেড়া তুলে ফেলে। পরে বিভিন্ন ক্রেতারা প্লট আকারে জমি দেখতে এলে প্রশান্ত সাহা তাদেরকে উচু জমি ও ভেতর থেকে রাস্তা হবে মর্মে জানায়। কিন্তু প্রশান্ত ক্রেতাদের উচু জমি দেখিয়ে উচ্চ মূল্যে জমি রেজিস্টিও করে দেন। সম্প্রতি সরেজমিনে ওই জমি বুঝিয়ে দিতে গেলে স্থানীয় কাউন্সিলর ও পৌর নায়েবের যোগসাযোশে রাস্তা তো দুরের কথা ক্রেতাদের খালের অন্তত ৫ ফিট ভেতরে গিয়ে খুটি গেড়ে জমি বুঝিয়ে দেন। এবং বলেন পরবর্তীতে ওই খালে কালভার্ট তৈরী হলে ক্রেতারা ড্রেনের উপর দিয়ে যাতায়াত করবে। এতে ক্রেতারা প্রতিবাদ করলে কাউন্সিলর আশুতোষ, জমির মালিক প্রশান্ত ও তার সহযোগিরা ক্রেতাদের সঙ্গে রুঢ় ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ গেছে। তাদেরকে বোঝানো হয় এ খাল অচিরেই কালভার্ট হয়ে যাবে আপনারা অচিরেই এ কালভার্টের উপর দিয়েই যাতায়াত করতে পারবেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন সাধারণ ক্রেতা বাধ্য হয়েই ওই সীমানা মেনে নিয়ে নিজ জমির প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেছেন। এতে খালটি ভরাট হওয়ার আশংকা দেখা গেছে। এলাকাবাসি অভিযোগ করেন, এই খালিটি বাঁচানোর চাইতে ওই ভূমি ব্যবসায়ীর পক্ষে প্লট ক্রেতাদের খালের জমি ধরিয়ে দেয়ায় আগ্রহই বেশী স্থানীয় কাউন্সিলরের। এ থেকেই বোঝা যায় তিনি নিশ্চয় উচ্চ হারে কমিশন খেয়েছেন। কিন্তু সঠিকভাবে পানি নিস্কাষন হতে না পারলে শহরের বিস্তির্ণ এলাকায় স্থায়ী জলাবন্ধতা সৃষ্টি হয়ে ব্যাপক জনদূর্ভোগ তৈরী হবে। তারা এ খাল দখলের বিরুদ্ধে জরুরী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকসহ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী জানান। একটি বিশ্বস্ত সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানান- স্থানীয় কাউন্সিলর আশুতোষ সাহা জমির মালিকের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে তার জমি রাস্তা ছাড়াই বিক্রি করে দেয়ার জন্য দায়িত্ব নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে দুজন প্লট ক্রেতা গোবিন্দ চন্দ্র সাহা ও সঞ্জয় বিশ্বাস জানান- জমি কেনা বেচার কথা হওয়ার সময় মালিক আমাদের উচু স্থান দেখিয়েছিলেন। জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার পর আমাকেসহ বেশ কয়েকজনকে খালের ভেতরে জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আমরা নিরিহ মানুষ। আমরা কি উড়ে উড়ে খাল পাড় হবো। আবার খালের উপর ব্যক্তিগতভাবে কোন স্থাপনা নির্মাণ করলেও তা হবে আইন বিরুদ্ধ। এ ব্যাপারে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। Magura Khal Dokhol Pic 4
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মাগুরা জেলা শাখার সভাপতি এ.টি.এম আনিসুর রহমান (এলএলবি) জানান- হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক নদী বা খালের প্রবহমান জলাধার একটি জীবন্ত সত্ত্বা। কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী ব্যক্তি প্রয়োজনে এ জলাধারকে বন্ধ কিংবা বাধাগ্রস্থ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে মাগুরা শহরের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দাসেদের ঘাটের এ খালটি দখলের পায়তারাকে আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা আশা করছি।
এ প্রসঙ্গে মাগুরা জেলা জজ আদালতের সিভিল আইনের বিজ্ঞ আইনজীবি এ্যাড. রিংকু গুহ জানান- জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ এর ২৯ নং আইন এর তৃতীয় অধ্যায়ের (ড) অনুচ্ছেদ মোতাবেক- দেশের খাল, জলাশয় ও সমাদ্র উপকুল দখল ও দূষণমুক্ত রাখিবার বিষয়ে সরকারকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সুপারিশ করবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে জনস্বার্থে এ খালটি রক্ষা ও দখল রোধে স্থানীয় প্রশাসন সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। তাছাড়া জমি বিক্রি করলে জমিতে যাওয়ার জন্য রাস্তার জায়গা দেয়াটাও বিক্রেতার এখতিয়ার ও ক্রেতার আইনি অধিকার।
এ প্রসঙ্গে একাধিক এলাকাবাসি অভিযোগ করেন, পৌর কাউন্সিলর আশুতোষ সাহা ও জমির মালিক প্রশান্ত সাহা পরস্পর যোগশাযোশে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এ খালের ভিতরের অন্তত ১০শতক জমি দখলের পায়তারা করছেন। যা এলাকার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করবে।
এ বিষয়ে জমির মালিক প্রশান্ত সাহা জানান- ওই খালের মধ্যে আমার প্রায় ৮ হাত জায়গা রয়েছে। আমি বেশীর ভাগ জায়গাই ছাড় দিয়েছি। তবে শত বছরের পুরাতন খালে কিভাবে তার জায়গা রয়েছে ও উচু জমি দেখিয়ে তিনি কেন ক্রেতাদের খালের ভাঙ্গনে জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন তার কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
পৌর কাউন্সিলর আশুতোষ সাহা জানান- সরজমিনে আমরা যেখাবে জায়গা পেয়েছি সেভাবেই ক্রেতাদের বুঝিয়ে দিয়েছি। তাতে কিছু অংশ খালের ভেতরে ঢুকে গেলে আমার করার কিছুই নেই। আমি কোন টাকা পয়সার লেনদেন করিনি।
এ ব্যাপারে মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসিন কবির জানান- খাল দখল করে নির্মাণ কাজ বা খালের পানি নিস্কাষনে বাধা দেয়া আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।

রূপক/মাগুরা /২ আগস্ট ২০২১






Comments are Closed