Main Menu

লগডাউনে করনীয় ২০- ডা. আব্দুল্লাহেল কাফী

72845409_2520472358060504_3834400034246361088_n

অনলাইন ডেস্ক, মাগুরাবার্তা
করোনার কারণে লগডাউনের এই সময়ে আমরা শিশুদের নিয়ে অনেক ধররেন সমস্যায় পড়ি। সমস্যা বড়দের নিয়েও কিংবা নিজেদেরও কম নয়। এ অবস্থায় কিছু বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে করনার সময় করনীয় নিয়ে নিজের ফেসবুকপেজে ২০টি পরামর্শ লিখেছেন মাগুরার জনপ্রিয় চিকিৎসক ও কবি ডা. আব্দুল্লাহেল কাফী, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, মাগুরা মেডিক্যাল কলেজ। মাগুরাবার্তার পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ পোষ্টটি তুলে ধরা হলো। 

আজ আমার স্ত্রী একটা ঘটনা জানালো আমাকে। তার কাছে এক পরিচিত মহিলা একটা সমস্যার ব্যাপারে সাজেশন চেয়ে ফোন করেছিলেন। সমস্যাটা খুলে বলি। উনার ভায়ের দুটো ছোট বাচ্চা। তাদের স্কুল বন্ধ। সারাদিন ছোট্ট দুটি ভাই ঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা দুজন মারামারি করছে সারাক্ষণ। তাদের মা দুজনকে শাসন করতে করতে অস্থির হয়ে উঠেছেন। এক পর্যায়ে একটু বেশি বকা দিলে এক বাচ্চা তার মায়ের হাত কামড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। ভদ্র মহিলা চিকিৎসা বিষয়ে সাজেশন চেয়েছেন আমার স্ত্রীর নিকট। এই ঘটনাটি উল্লেখ করার কারন বলছি।করোনা মহামারীর এই ভয়াবহ সময়ে এই ঘটনাটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকের একটা প্রকট অবস্থা আমাদের সামনে উম্মোচিত করে। দীর্ঘদিন ধরে জরুরী কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তি ছাড়া প্রায় সকলেই গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। এর ফলে বেশিরভাগ মানুষের জীবনে একঘেয়েমি অবস্থা দেখা দিয়েছে। ঘরে বসে টিভি দেখা, ল্যাপটপ বা মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানো, বই পড়া বা ঘরের টুকিটাকি কাজ করা ছাড়া আর কোন বিনোদন বা সামাজিক মেলামেশার সুযোগ নেই মানুষের। তাছাড়া করোনার ভয়াবহতার খবর প্রতিনিয়ত মানুষকে আতংকিত করে তুলছে। ফলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা, আতংক, হতাশা, ধৈর্যহীনতা, অল্পতেই মেজাজ গরম হওয়া, বিরক্তি, নিদ্রাহীনতা,অবসন্নতা, মেন্টাল ডিপ্রেশন, মৃত্যুভয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যাদের বয়স সত্তুর, পঁচাত্তর বা আশি বা তারচেয়ে বেশি, সাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, এজমা, ক্যান্সার, মানষিক রোগ ও অন্যান্য জটিল রোগ আছে, সেইসব মানুষগুলো এখন প্রতিনয়ত মৃত্যুভয়ে কাতর হয়ে আছেন। তদুপরি, করোনার আতংক যেভাবে মানুষের মমতা, ভালবাসা কে কেড়ে নিয়েছে তাও আমাদের মনোজগতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। করোনায় মারা গেলে আপনজনরাও দূরে চলে যাচ্ছে৷ ফিরেও তাকাচ্ছে না প্রিয় মানুষটির দিকে। ভাবা যায়! কি ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাদের ! মানুষের ভালবাসা, মমতা, মানবিকতা আজ তিরোহিত হতে বসেছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে মানুষের মানষিক স্বাস্থ্য আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। এই অবস্থায় আমি কিছু সাজেশন রাখতে চাই। যদি কারো ন্যুনতম কাজে লাগে, তাহলে আমি খুশি হব।

১. পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘরের কাজগুলো বন্টন করে দিন এবং সবাইকে সেগুলো করার ব্যাপারে উৎসাহিত করুন।

২. পরিবারের সকলের মধ্যে হাসি, আনন্দ, হালকা রসিকতা, গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, লেখালেখি এগুলি চর্চা করুন।

৩. পরিবারের সদস্যদেরকে ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে উৎসাহিত করুন। এটা মানুষের মনে প্রশান্তি আনয়ন করে।

৪. পরিবারের বয়োবৃদ্ধ আপনজন দের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখুন, সংগ দিন।

৫. যারা বাবা মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকেন, তারা প্রতিদিন ফোনে বৃদ্ধ বাবা, মায়ের সাথে কথা বলুন, সুবিধা, অসুবিধা গুলো জানুন এবং সমাধান করুন।

৬. পরিবারের সদস্যদের সাথে একসাথে বসে খাবার গ্রহন করুন, আনন্দময় কিছু কথা বলুন।

৭. দূরে আছেন, এরকম আপনজন দের সাথে মাঝে মাঝে কথা বলুন, ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে সাহায্য করুন অথবা সাজেশন দিন।

৮. রাতের খাবার পর পরিবারের সবাইকে নিয়ে পূরনো কোন মধুর, আনন্দময় স্মৃতিচারণ করুন।

৯. সন্ধ্যায়, রাত্রে খাবার পর কিংবা সকালে যার যার পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করুন।

১০. শিশুদের অতিরিক্ত শাসন করবেন না। আদর, মমতা দিয়ে, বুঝিয়ে দুষ্টুমি বা অস্থিরতা করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন।

১১. পরিবারের সকলকে সাথে নিয়ে পূরনো দিনের সুন্দর কিছু গান, হালকা, কমেডি ধরনের মুভি, সিরিয়াল (যেমনঃ মিঃ বীন, থ্রি স্টুজেস, হুমায়ুন আহমেদের কিছু হাল্কা বিনোদন মূলক নাটক ইত্যাদি) উপভোগ করুন।

১২. পরিবারের সদস্যদের সাথে লুডু, ক্যারাম, দাবা, টিটি ইত্যাদি খেলেও সুন্দর সময় কাটাতে পারেন।

১৩. স্কুল পড়ুয়া শিশুদের সাথে ওয়ার্ড মেকিং গেম খেলতে পারেন, তাতে তারা আনন্দ পাবে, নতুন নতুন শব্দও শিখতে পারবে।

১৪. পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুন্দর, আনন্দদায়ক কোন টিভি প্রোগ্রাম দেখতে পারেন।

১৫. পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে মিলে মিশে কাজ করে কিছু খাবার রান্না করে সুন্দর কিছু সময় কাটাতে পারেন। বিশেষ করে স্বামীগন স্ত্রীদের কে সংসারের কাজে সাহায্য করে, রান্না করে বা রান্নায় সহায়তা করে সুন্দর আনন্দদায়ক কিছু সময় কাটাতে পারেন।

১৬. দেশে বা বিদেশে, দূরে অবস্থানরত আপনজন দের সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলে তাদের হাসি মুখ গুলো দেখে কিছু আনন্দময় সময় কাটাতে পারেন।

১৭. পরিবারের সদস্যদের আকস্মিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলার জন্য আপনার চিকিৎসকের অথবা কোন আত্মীয়/ পরিচিত চিকিৎসকের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে রাখুন।

১৮. পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের ক্রনিক রোগের (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, মানষিক রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি) ওষুধ ২/৩ মাসের জন্য সংগ্রহ করে রাখুন। চিকিৎসকের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে রাখুন।

১৯. আপনার গরীব আত্মীয়, গরীব প্রতিবেশী, অন্যান্য গরীব মানুষের খবর রাখুন। তাদের কে সাধ্যমত সাহায্য করুন।

২০. আপনার বাসায় যে মেয়েটি বা মহিলাটি কাজ করে বা করতো, তার খবর রাখুন, সাধ্যমত তার পরিবারকে সাহায্য করুন।

আসুন আমরা আমাদের পরিবার, প্রতিবেশী ও আপনজনদের মানষিক স্বাস্থ্য সমুন্নত রাখতে সচেতন হই। সবাই ভাল থাকুন। সুস্থ্য থাকুন। মানষিক ভাবে উৎফুল্ল থাকুন।

মাগুরা/ ১৪এপ্রিল ২০২০

 






Comments are Closed